লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
ইসলামে যুদ্ধ, শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক ন্যায়বিচারের দায়িত্বকে খুব গভীরভাবে আলোচিত করা হয়েছে। কুরআন বারবার নির্দেশ দিয়েছে, যে কোনো নীতি বা বিধান মান্য করার সময় নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের ভার কখনো অবহেলিত হতে পারে না। কিন্তু কিছু হাদিসের আক্ষরিক ব্যাখ্যা কুরআনের নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।
এই প্রবন্ধে আমরা বিশেষভাবে আলোচনা করব হাদিসটি—
“আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ থেকে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত। তবে ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোনো কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত।”
(সহিহ মুসলিম ১/৫, হাদিস নং ৬০২২; আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯; আধুনিক প্রকাশনী: ইসলামী ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ৭, ১৮)
আমরা এই হাদিসকে কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করব এবং দেখব কোথায় এটি নৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।
হাদিসটি আক্ষরিকভাবে যে দিকগুলো নির্দেশ করে:
আক্ষরিক অর্থে হাদিসটি একটি নির্দিষ্ট শর্তে নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিতকরণের নির্দেশ প্রদান করছে। কিন্তু কুরআনের নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্রায়শই অসঙ্গত মনে হয়।
কুরআন স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, যুদ্ধ বা শান্তি নির্ভর করে মানুষের আচরণ, ন্যায়বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ওপর, শুধুমাত্র সাক্ষ্য বা নামাজ-জাকাতের ওপর নয়।
“وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ”
“আল্লাহর পথে লড়াই করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তবে অতিরিক্ত নিপীড়ন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিরিক্ত নিপীড়নকারীদের ভালোবাসেন না।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৯০)
এখানে যুদ্ধের শর্ত প্রতিরোধমূলক, অতিরিক্ত নিপীড়ন বা অন্যায়ে অংশগ্রহণ কদাপি সমর্থিত নয়। হাদিসের আক্ষরিক দৃষ্টিকোণ—যুদ্ধ বন্ধ হবে শুধুমাত্র মৌলিক সাক্ষ্য ও ইবাদতের ওপর—কুরআনের নৈতিক নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
কুরআন আরও নির্দেশ দেয়, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল মাধ্যম হলো ন্যায়বিচার, সততা এবং সৎকর্ম:
“وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ”
“যে জীবন আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন, তা সত্যি কারণ ছাড়া হত্যা করো না।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৩)
এখানে আবারও দেখা যাচ্ছে—নিরাপত্তা নির্ভর করছে কোনও ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের আচরণের ওপর, কেবল মৌলিক ইবাদতের নয়।
হাদিসে বলা হয়েছে, নামাজ ও যাকাত আদায় করা হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সীমিত এবং অসম্পূর্ণ ধারণা।
“وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْأُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا”
“যে কেউ সৎকর্ম করে—পুরুষ হোক বা নারী—এবং সে মুমিন হয়, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে; তাদের প্রতি কিছু অংশেও অন্যায় করা হবে না।”
(সূরা আন-নিসা ৪:১২৪)
নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার কেবল নামাজ-জাকাতের ওপর নির্ভর করে না, বরং নিয়মিত সৎকর্ম ও নৈতিক আচরণের ওপর নির্ভর করে। হাদিসের আক্ষরিক দৃষ্টিকোণ এই কুরআনিক নীতির সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে।
হাদিসে “স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত” নেওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এটি আংশিকভাবে সমস্যা সমাধান করে, কিন্তু মূল বিষয় হলো—নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি সৎকর্ম ও নৈতিকতার ওপর।
“وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ”
“ন্যায়ের সঙ্গে মাপ নাও এবং ভারসাম্য ক্ষয় করো না।”
(সূরা আর-রাহমান ৫:৯)
কুরআন নির্দেশ দেয়—নিরাপত্তা বা ন্যায়বিচার কখনো কেবল মৌলিক সাক্ষ্য বা নামাজ-জাকাতের ওপর নির্ভরশীল নয়।
ইতিহাস ও বাস্তবতাও এটি প্রমাণ করে। বিভিন্ন সময়ে এমন পরিস্থিতি ঘটেছে যেখানে মুসলিমরা মৌলিক সাক্ষ্য ও নামাজ-জাকাত পালন করলেও যুদ্ধ, সংঘাত ও অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা পায়নি। কেবল ঈমান বা ইবাদত যথেষ্ট নয়।
কুরআন বারবার নির্দেশ দেয়, মানুষ নিজের কাজের জন্য নিজেই দায়ী:
“وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ”
“মানুষ যা নিজে চেষ্টা করে, তাই তার প্রাপ্য।”
(সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯)
হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে:
কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে:
অতএব, হাদিসটি কুরআনের মানদণ্ডে আক্ষরিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরআনই মীযান। যে বর্ণনা সেই মীযানে টেকে না, তা যত পরিচিত হোক, ধর্ম হতে পারে না।
