• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন

তক্দীর আগেই লিখে রাখা ও ভ্রূণের ভাগ্য নির্ধারণ

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১২১ Time View
Update : রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

তক্দীর আগেই লিখে রাখা ও ভ্রূণের ভাগ্য নির্ধারণ—হাদিসসমূহের কুরআনিক পর্যালোচনা

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

কুরআন মানুষের জীবনকে উপস্থাপন করে পরীক্ষা, স্বাধীন নির্বাচন ও দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে। মানুষ তার কর্মের জন্য নিজেই জবাবদিহি করবে—এটাই কুরআনের মূল শিক্ষা। অথচ কিছু প্রচলিত হাদিসে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, মানুষ সৃষ্টির বহু আগেই তার ভাগ্য, আমল, রিযিক, মৃত্যু এমনকি সে সৎ না অসৎ হবে—সব লিখে ফেলা হয়েছে। এতে একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে—এই ধরনের ‘আগাম নির্ধারণমূলক লেখা’ কি আল্লাহর কিতাবে আছে?


আলোচ্য হাদিসসমূহ (আরবি ও বাংলা)

১) সৃষ্টির আগে তক্দীর লেখা

আরবি:

كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

বাংলা অর্থ:
“আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতের তক্দীর লিখে রেখেছেন।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ১/৭৩)


২) গর্ভেই আমল ও পরিণতি লিখে দেওয়া

আরবি:

إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يُرْسَلُ إِلَيْهِ الْمَلَكُ فَيَكْتُبُ أَرْبَعَ كَلِمَاتٍ: بِكَتْبِ رِزْقِهِ، وَأَجَلِهِ، وَعَمَلِهِ، وَشَقِيٍّ أَوْ سَعِيدٍ

বাংলা অর্থ:
“তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন শুক্ররূপে, তারপর চল্লিশ দিন জমাট রক্তপিণ্ডরূপে, তারপর চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ডরূপে হয়। এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান; সে চারটি বিষয় লিখে দেয়—তার রিযিক, তার মৃত্যু, তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ১/৭৬)


সমস্যার মূল দিক

এই হাদিসগুলো মিলিয়ে যে ধারণা দাঁড়ায় তা হলো—

  • মানুষ জন্মের আগেই
    • কী আমল করবে
    • কতদিন বাঁচবে
    • কী পরিমাণ রিযিক পাবে
    • জান্নাতি না জাহান্নামি হবে
      সব লিখে ফেলা হয়েছে

এই ধারণা সরাসরি প্রশ্ন তোলে—

  • তাহলে মানুষের ইখতিয়ার (স্বাধীনতা) কোথায়?
  • বিচার, পরীক্ষা ও জবাবদিহির অর্থ কী থাকে?
  • আল্লাহর কিতাবে কি এমন আগাম নির্ধারণমূলক লেখা-লেখির কথা আছে?

কুরআনের আলোকে পর্যালোচনা

১) মানুষ নিজ কর্মের জন্য দায়ী

আরবি:

كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ

বাংলা অর্থ:
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮)

➡️ দায়বদ্ধতা তখনই অর্থবহ, যখন কর্ম পূর্বনির্ধারিত নয়


২) পথ দেখানো হয়েছে—পছন্দ মানুষের

আরবি:

إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

বাংলা অর্থ:
“আমি তাকে পথ দেখিয়েছি—হোক সে কৃতজ্ঞ, অথবা অকৃতজ্ঞ।”
(সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)

➡️ এখানে ভবিষ্যৎ লেখা নয়, নির্বাচনের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে।


৩) আল্লাহ কারও উপর জুলুম করেন না

আরবি:

وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ

বাংলা অর্থ:
“তোমার রব বান্দাদের প্রতি জুলুমকারী নন।”
(সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬)

➡️ জন্মের আগেই কাউকে সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা লিখে দেওয়া হলে বিচার জুলুমে পরিণত হয়।


৪) রিযিক ও মৃত্যু—জ্ঞান, লিখে দেওয়া নয়

কুরআন বলে—

আরবি:

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহই রিযিকদাতা।”
(সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৮)

কিন্তু কোথাও বলেনি যে, ব্যক্তিভিত্তিক রিযিক আগে লিখে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়


৫) ভবিষ্যৎ আল্লাহ জানেন, কিন্তু নির্ধারণ করেন না

আরবি:

وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

বাংলা অর্থ:
“তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞাত।”
(একাধিক আয়াত)

➡️ জ্ঞান (علم) আর আগাম বাধ্যতামূলক নির্ধারণ এক বিষয় নয়।


ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ

এখানে কুরআন ও হাদিসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট—

  • কুরআন:
    • মানুষকে পরীক্ষা করা হয়
    • সে নিজে পথ বেছে নেয়
    • পরে তার কর্ম লেখা ও হিসাব নেওয়া হয়
  • হাদিস:
    • জন্মের আগেই
    • আমল, পরিণতি, সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য
    • সব লিখে ফেলা হয়

এই ধারণা গ্রহণ করলে—

  • পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যায়
  • তওবা, সংশোধন ও চেষ্টা নিষ্ফল হয়
  • জান্নাত–জাহান্নাম আগেই নির্ধারিত নাটকে পরিণত হয়

যা কুরআনের বিচার, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


উপসংহার

কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—

  • আল্লাহ মানুষকে পথ দেখান, বাধ্য করেন না
  • বিচার হবে মানুষের অর্জিত কর্মের ভিত্তিতে
  • জন্মের আগেই আমল ও পরিণতি লিখে দেওয়ার কোনো ধারণা কুরআনে নেই
  • আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী, কিন্তু তা জবরদস্তিমূলক তক্দীর নয়

ফয়সালা:
উপরোক্ত হাদিসসমূহে বর্ণিত তিন ধরনের আগাম “লেখা-লেখি”—
১) সৃষ্টির আগে তক্দীর লেখা
২) গর্ভেই আমল নির্ধারণ
৩) সৌভাগ্য–দুর্ভাগ্য পূর্বনির্ধারণ

—এই ধারণাগুলো আল্লাহর কিতাবে পাওয়া যায় না
অতএব, এগুলো কুরআনিক ন্যায়বিচার ও মানব-স্বাধীনতার মানদণ্ডে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page