লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন মানুষের জীবনকে উপস্থাপন করে পরীক্ষা, স্বাধীন নির্বাচন ও দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে। মানুষ তার কর্মের জন্য নিজেই জবাবদিহি করবে—এটাই কুরআনের মূল শিক্ষা। অথচ কিছু প্রচলিত হাদিসে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, মানুষ সৃষ্টির বহু আগেই তার ভাগ্য, আমল, রিযিক, মৃত্যু এমনকি সে সৎ না অসৎ হবে—সব লিখে ফেলা হয়েছে। এতে একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে—এই ধরনের ‘আগাম নির্ধারণমূলক লেখা’ কি আল্লাহর কিতাবে আছে?
আরবি:
كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
বাংলা অর্থ:
“আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতের তক্দীর লিখে রেখেছেন।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ১/৭৩)
আরবি:
إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يُرْسَلُ إِلَيْهِ الْمَلَكُ فَيَكْتُبُ أَرْبَعَ كَلِمَاتٍ: بِكَتْبِ رِزْقِهِ، وَأَجَلِهِ، وَعَمَلِهِ، وَشَقِيٍّ أَوْ سَعِيدٍ
বাংলা অর্থ:
“তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন শুক্ররূপে, তারপর চল্লিশ দিন জমাট রক্তপিণ্ডরূপে, তারপর চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ডরূপে হয়। এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান; সে চারটি বিষয় লিখে দেয়—তার রিযিক, তার মৃত্যু, তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ১/৭৬)
এই হাদিসগুলো মিলিয়ে যে ধারণা দাঁড়ায় তা হলো—
এই ধারণা সরাসরি প্রশ্ন তোলে—
আরবি:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
বাংলা অর্থ:
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮)
➡️ দায়বদ্ধতা তখনই অর্থবহ, যখন কর্ম পূর্বনির্ধারিত নয়।
আরবি:
إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا
বাংলা অর্থ:
“আমি তাকে পথ দেখিয়েছি—হোক সে কৃতজ্ঞ, অথবা অকৃতজ্ঞ।”
(সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)
➡️ এখানে ভবিষ্যৎ লেখা নয়, নির্বাচনের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে।
আরবি:
وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ
বাংলা অর্থ:
“তোমার রব বান্দাদের প্রতি জুলুমকারী নন।”
(সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬)
➡️ জন্মের আগেই কাউকে সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা লিখে দেওয়া হলে বিচার জুলুমে পরিণত হয়।
কুরআন বলে—
আরবি:
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহই রিযিকদাতা।”
(সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৮)
কিন্তু কোথাও বলেনি যে, ব্যক্তিভিত্তিক রিযিক আগে লিখে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।
আরবি:
وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
বাংলা অর্থ:
“তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞাত।”
(একাধিক আয়াত)
➡️ জ্ঞান (علم) আর আগাম বাধ্যতামূলক নির্ধারণ এক বিষয় নয়।
এখানে কুরআন ও হাদিসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট—
এই ধারণা গ্রহণ করলে—
যা কুরআনের বিচার, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—
ফয়সালা:
উপরোক্ত হাদিসসমূহে বর্ণিত তিন ধরনের আগাম “লেখা-লেখি”—
১) সৃষ্টির আগে তক্দীর লেখা
২) গর্ভেই আমল নির্ধারণ
৩) সৌভাগ্য–দুর্ভাগ্য পূর্বনির্ধারণ
—এই ধারণাগুলো আল্লাহর কিতাবে পাওয়া যায় না।
অতএব, এগুলো কুরআনিক ন্যায়বিচার ও মানব-স্বাধীনতার মানদণ্ডে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
