• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ১৯০

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ১৯০

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

অনুবাদ
আর আল্লাহর পথে তোমরা তাদের সঙ্গে লড়াই করো, যারা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।


এই আয়াতটি কুরআনের যুদ্ধনীতি, প্রতিরোধনীতি ও ন্যায়নীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। কুরআন যুদ্ধকে এখানে কোনো স্বাভাবিক বা কাঙ্ক্ষিত অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং এটিকে একটি সীমাবদ্ধ, শর্তযুক্ত ও নৈতিক কাঠামোর ভেতরে আবদ্ধ দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেছে। এই আয়াত না বুঝলে কুরআনের “জিহাদ”, “কিতাল” কিংবা প্রতিরোধের ধারণা হয় অতিরঞ্জিত হয়ে যায়, নয়তো সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে পড়ে।

আয়াতের শুরুতেই কুরআন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করেছে—“আল্লাহর পথে।” এই শব্দবন্ধটি কুরআনের দৃষ্টিতে একটি নৈতিক ফিল্টার। আল্লাহর পথে মানে এমন একটি পথে, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোত্রীয় প্রতিহিংসা, জাতীয়তাবাদ, ক্ষমতার লালসা বা অর্থনৈতিক আধিপত্যের কোনো স্থান নেই। আল্লাহর পথে লড়াই মানে হলো ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, জুলুম প্রতিরোধ করা এবং মানুষের ওপর মানুষের অন্যায় কর্তৃত্ব ভেঙে দেওয়া।

এই কারণেই কুরআন বারবার আল্লাহর পথকে মানুষের পথ থেকে আলাদা করেছে। মানুষের পথে যুদ্ধ মানে হয় দখল, আধিপত্য, সম্পদ বা প্রতিশোধ। আর আল্লাহর পথে যুদ্ধ মানে হয়—অন্যায়ের অবসান এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা। এই পার্থক্য না বুঝলে আয়াতটির অর্থ সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়।

এরপর কুরআন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়—“যারা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে।” এখানে লক্ষ্য করা জরুরি, কুরআন বলেনি “যারা তোমাদের মতো বিশ্বাস করে না”, বলেনি “যারা তোমাদের বিরোধিতা করে”, বলেনি “যারা তোমাদের সমালোচনা করে।” বরং কেবল তাদের কথাই বলা হয়েছে, যারা বাস্তবভাবে সহিংসতা চাপিয়ে দেয়, অস্ত্র হাতে আগ্রাসন চালায়, জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।

এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে কুরআনের যুদ্ধনীতি মূলত প্রতিরক্ষামূলক। যুদ্ধ এখানে বিশ্বাসের কারণে নয়, বরং আগ্রাসনের কারণে। কেউ যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়, ভিন্ন চিন্তাধারার হয়, এমনকি শত্রুভাবাপন্নও হয়—তাতে যুদ্ধ বৈধ হয়ে যায় না, যতক্ষণ না সে সহিংসতায় লিপ্ত হয়।

এই আয়াত সেই ধারণাকেও ভেঙে দেয় যে ইসলাম নাকি “ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার” দীন। কারণ কুরআন যদি তা-ই চাইত, তাহলে যুদ্ধের শর্ত হিসেবে “যারা ঈমান আনে না” বলা হতো। কিন্তু কুরআন তা বলেনি। বরং কুরআনের যুদ্ধনীতি সরাসরি সহিংস আগ্রাসনের সাথে যুক্ত।

এরপর আসে আয়াতের সবচেয়ে গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা—“কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটির ভেতর কুরআনের পুরো নৈতিক দর্শন লুকিয়ে আছে। সাধারণভাবে যুদ্ধ মানেই সীমা ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্র; কিন্তু কুরআন যুদ্ধের ভেতরেও সীমা টেনে দিয়েছে।

এই সীমালঙ্ঘন কী—তা কুরআন নিজেই অন্যান্য আয়াতে ব্যাখ্যা করেছে। নিরপরাধ মানুষ হত্যা, যুদ্ধের বাইরে সাধারণ জনগণের ক্ষতি, নারী ও শিশুদের ওপর আঘাত, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, প্রতিশোধের নামে নিষ্ঠুরতা, বন্দিদের ওপর নির্যাতন, চুক্তিভঙ্গ—এসবই সীমালঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যুদ্ধেও ন্যায়বিচার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।

এখানে একটি গভীর বিষয় লক্ষণীয়—কুরআন সীমালঙ্ঘনকে কেবল শত্রুর অপরাধ হিসেবে দেখেনি; বরং নিজের পক্ষ থেকেও যদি সীমা লঙ্ঘন করা হয়, তবে সেটিও আল্লাহর কাছে অপরাধ। এই কারণেই আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেন—“নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।” তিনি বলেননি “অবিশ্বাসীদের ভালোবাসেন না”, বরং বলেছেন “সীমালঙ্ঘনকারীদের।” অর্থাৎ সীমা লঙ্ঘনকারী যদি মুসলিম পরিচয়ধারীও হয়, তবুও সে আল্লাহর অপছন্দের তালিকায় পড়ে যায়।

এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আয়াতের অর্থ বুঝতে সাহায্য করে। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় নির্যাতিত হওয়ার পর, মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রতিরোধের অনুমতি পায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিশোধের আবেগ প্রবল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু কুরআন শুরুতেই সেই আবেগকে শাসন করে বলে দেয়—যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমা ছাড়িও না।

এটি প্রমাণ করে, কুরআন যুদ্ধকে উসকে দিতে আসেনি; বরং যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করতে এসেছে। কুরআনের দৃষ্টিতে যুদ্ধ কোনো গৌরবের বিষয় নয়, বরং এটি একটি কঠিন, দুঃখজনক কিন্তু কখনো কখনো অপরিহার্য দায়িত্ব।

এই আয়াতকে যদি ২২:৩৯–৪০ আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়া হয়, তবে একটি পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়। সেখানে বলা হয়েছে—যাদের ওপর জুলুম হয়েছে, তাদেরকে প্রতিরোধের অনুমতি দেওয়া হয়েছে; আর যদি এই প্রতিরোধ না থাকত, তবে উপাসনালয়গুলো ধ্বংস হয়ে যেত। ২:১৯০ আয়াত সেই প্রতিরোধের সীমা নির্ধারণ করে দেয়, যাতে ন্যায়ের নামে অন্যায় না ঘটে।

এই আয়াত আজকের পৃথিবীতেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একদিকে কিছু মানুষ এই আয়াতের প্রথম অংশ ধরে সহিংসতা বৈধ করতে চায়, কিন্তু দ্বিতীয় অংশ—“সীমালঙ্ঘন করো না”—ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে। অন্যদিকে কিছু মানুষ যুদ্ধসংক্রান্ত সব আয়াতকে ইতিহাসে বন্দি করে দিতে চায়, যেন আজ জুলুম হলেও প্রতিরোধের কোনো অধিকার নেই। দুটো অবস্থানই কুরআনের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষার বিরুদ্ধে।

এই আয়াত আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও একটি গভীর শিক্ষা দেয়। যখন আমাদের ওপর অন্যায় হয়, প্রতিক্রিয়া বৈধ; কিন্তু সীমা ছাড়ানো বৈধ নয়। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে যদি আমরা নিজেরাই অন্যায়কারী হয়ে উঠি, তবে আমরা আল্লাহর ভালোবাসা হারাই।


এই বিষয়ে কুরআনের সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
২২:৩৯ — নির্যাতিতদের প্রতিরোধের অনুমতি
২২:৪০ — উপাসনালয় রক্ষার জন্য প্রতিরোধ
৪:৭৫ — নির্যাতিত নারী, পুরুষ ও শিশুদের পক্ষে সংগ্রাম
২:২৫১ — আল্লাহ মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত করেন
৫:৮ — ন্যায়বিচারে অবিচল থাকা, শত্রুর প্রতিও


বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

সূরা বাকারা : আয়াত ১৯০ আমাদের শেখায়—ইসলাম কোনো নিষ্ক্রিয় দীন নয়, আবার কোনো সীমাহীন সহিংস মতবাদও নয়। এটি ন্যায়ভিত্তিক, সীমাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল জীবনব্যবস্থা। এখানে প্রতিরোধ আছে, কিন্তু প্রতিহিংসা নেই; শক্তি আছে, কিন্তু উন্মত্ততা নেই; সংগ্রাম আছে, কিন্তু সীমাহীন ধ্বংস নেই।

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর পথে দাঁড়ানো মানে শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো। আর সেই জায়গাতেই কুরআনের যুদ্ধনীতি অন্য সব মানবিক মতবাদের চেয়ে আলাদা ও উচ্চতর হয়ে ওঠে।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x