• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ২৫১

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৬৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ২৫১

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত
فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَقَتَلَ دَاوُۥدُ جَالُوتَ وَءَاتَىٰهُ ٱللَّهُ ٱلْمُلْكَ وَٱلْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُۥ مِمَّا يَشَآءُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍۢ لَّفَسَدَتِ ٱلْأَرْضُ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى ٱلْعَـٰلَمِينَ

অনুবাদ
অতঃপর তারা আল্লাহর অনুমতিতে তাদেরকে পরাস্ত করল। আর দাউদ জালূতকে হত্যা করলেন। আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং যা তিনি চাইলেন তাকে তা শিক্ষা দিলেন। আর যদি আল্লাহ মানুষের এক দলকে আরেক দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে পৃথিবী অবশ্যই বিপর্যস্ত হয়ে যেত; কিন্তু আল্লাহ সকল সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহশীল।


এই আয়াতটি কুরআনের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক ভারসাম্য, শক্তি ও ন্যায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ইতিহাস পরিচালনায় আল্লাহর সুন্নাহ—এই সবকিছুকে একত্রে উপস্থাপন করে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধবর্ণনা নয়; বরং মানবসভ্যতা কীভাবে ধ্বংস থেকে রক্ষা পায়, সেই মৌলিক নীতির একটি কুরআনিক ঘোষণা।

এই আয়াতের পটভূমি হলো তালূত–জালূত সংঘর্ষের ঘটনা। কিন্তু কুরআন এখানে কেবল ইতিহাস বলার জন্য ইতিহাস বলেনি। বরং ইতিহাসের ভেতর দিয়ে একটি সার্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে—ন্যায়ের পক্ষে শক্তির প্রয়োজন আছে, আর সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ নিজেই।

আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে—“অতঃপর তারা আল্লাহর অনুমতিতে তাদেরকে পরাস্ত করল।” এই বাক্যটি মানবীয় প্রচেষ্টা ও আল্লাহর ইচ্ছার মধ্যকার সম্পর্ক পরিষ্কার করে। কুরআন এখানে বলেনি যে তারা কেবল নিজেদের শক্তিতে জয়ী হয়েছে, আবার এটাও বলেনি যে তারা বসে ছিল আর অলৌকিকভাবে জয় এসেছে। বরং বলা হয়েছে—মানুষ চেষ্টা করেছে, লড়াই করেছে, কিন্তু ফলাফল এসেছে আল্লাহর অনুমতিতে।

এটি কুরআনের একটি মৌলিক শিক্ষা—মানুষ দায়িত্ব পালন করবে, আর ফলাফল আল্লাহর হাতে। এই আয়াত সেই ভ্রান্ত ধারণাও ভেঙে দেয় যে ঈমান মানে নাকি কেবল অপেক্ষা করা। এখানে ঈমান মানে প্রস্তুতি, দৃঢ়তা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা—এই তিনের সমন্বয়।

এরপর কুরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করে—“আর দাউদ জালূতকে হত্যা করলেন।” এখানে দাউদের পরিচয় তখনো একজন নবী বা রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তিনি একজন সাধারণ সৈনিক। এই অংশটি কুরআনের সামাজিক দর্শনের একটি গভীর দিক প্রকাশ করে—আল্লাহর কাছে মর্যাদা বংশ, পদ বা বাহিনীর আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় ঈমান, সাহস ও ন্যায়ের অবস্থানের মাধ্যমে।

জালূত ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক প্রতীক। বাহ্যিক বিচারে দাউদের কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু কুরআন দেখায়—যখন শক্তি অন্যায়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন আল্লাহ সেই শক্তিকে ভেঙে দিতে দুর্বল বলে বিবেচিত কাউকে মাধ্যম বানান।

এরপর আয়াত বলে—“আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন।” এখানে রাজত্ব ও প্রজ্ঞাকে আলাদা করে উল্লেখ করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআন বুঝিয়ে দেয়—শুধু ক্ষমতা থাকলেই যথেষ্ট নয়; ক্ষমতার সঙ্গে হিকমাহ বা প্রজ্ঞা না থাকলে তা জুলুমে পরিণত হয়। আবার কেবল জ্ঞান থাকলেও ক্ষমতা না থাকলে তা সমাজ রক্ষায় কার্যকর হয় না।

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়—আদর্শ রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনের জন্য শক্তি ও প্রজ্ঞার সমন্বয় অপরিহার্য। একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এরপর বলা হয়েছে—“এবং যা তিনি চাইলেন তাকে তা শিক্ষা দিলেন।” এই বাক্যটি জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে কুরআনের অবস্থান স্পষ্ট করে। কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহর দান। মানুষ চেষ্টা করে, শেখে, অনুসন্ধান করে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের দরজা খুলে দেন আল্লাহ।

এরপর আসে আয়াতের সবচেয়ে সার্বজনীন ও গভীর ঘোষণা—“আর যদি আল্লাহ মানুষের এক দলকে আরেক দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে পৃথিবী অবশ্যই বিপর্যস্ত হয়ে যেত।”

এই অংশটি কুরআনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে কুরআন ঘোষণা করছে—পৃথিবীতে ন্যায় টিকে থাকে সংঘর্ষহীন অবস্থায় নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিরোধের মাধ্যমে। যদি জুলুমকারীকে প্রতিরোধ করার মতো শক্তি না থাকত, তবে মানবসভ্যতা টিকে থাকত না।

এই আয়াত সেই আদর্শবাদী ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে, যা বলে—সবাই ভালো হয়ে গেলে পৃথিবী ঠিক হয়ে যাবে। কুরআন বাস্তববাদী। কুরআন জানে—মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লালসা থাকবে, জুলুম থাকবে। তাই আল্লাহর সুন্নাহ হলো—এক শক্তিকে আরেক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা।

এখানে “দাফ‘” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ প্রতিহত করা, ঠেকিয়ে দেওয়া, ভারসাম্য সৃষ্টি করা। এটি আক্রমণাত্মক ধ্বংস নয়; বরং ধ্বংস ঠেকানোর প্রক্রিয়া।

এই আয়াতকে যদি ২২:৪০ আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া হয়, তাহলে একই নীতি পুনরায় দেখা যায়—যদি আল্লাহ মানুষকে মানুষ দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে মসজিদ, গির্জা, উপাসনালয় ধ্বংস হয়ে যেত। অর্থাৎ প্রতিরোধ শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং মানবসভ্যতার সুরক্ষার জন্য।

এই আয়াত সেই ভ্রান্ত ধারণাও খণ্ডন করে যে ইসলাম নাকি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার ধর্ম। বরং ইসলাম সমাজ, রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রতিরোধ—সবকিছুকে বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করে।

এরপর আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে—“কিন্তু আল্লাহ সকল সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহশীল।” এই বাক্যটি পুরো আয়াতের ভারসাম্য রক্ষা করে। যুদ্ধ, প্রতিরোধ, সংঘর্ষ—এসব আল্লাহর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। এগুলো হলো অনুগ্রহ রক্ষার মাধ্যম। যদি এই প্রতিহতকরণ না থাকত, তবে জুলুম সর্বগ্রাসী হয়ে উঠত।

এই আয়াত আমাদের শেখায়—শান্তি আসে শক্তিহীনতা থেকে নয়; বরং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান থেকে। আবার শক্তি মানেই শান্তি নয়; শক্তি যদি ন্যায়ের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে সেটিই বিপর্যয়ের মূল কারণ হয়।


এই বিষয়ে কুরআনের সম্পর্কিত আয়াতসমূহ
২২:৩৯ — নির্যাতিতদের প্রতিরোধের অনুমতি
২২:৪০ — উপাসনালয় রক্ষায় প্রতিহতকরণ
৪:৭৫ — নির্যাতিত মানুষের পক্ষে সংগ্রাম
৮:৬০ — শক্তি প্রস্তুতির নির্দেশ
৫৭:২৫ — ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি


বর্তমান প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

সূরা বাকারা : আয়াত ২৫১ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—ইতিহাস কোনো দুর্ঘটনার ফল নয়; এটি আল্লাহর সুন্নাহর অধীনে পরিচালিত। ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘর্ষ অনিবার্য, কিন্তু সেই সংঘর্ষের ভেতরেই আল্লাহ পৃথিবীকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন।

আজকের দুনিয়ায় যখন কেউ প্রতিরোধের কথা বললে তাকে চরমপন্থী বলা হয়, আবার কেউ শক্তির নামে সীমালঙ্ঘন করে—এই আয়াত আমাদের ভারসাম্য শেখায়। না নিস্ক্রিয়তা, না সীমাহীন আগ্রাসন—বরং দায়িত্বশীল প্রতিহতকরণ।

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর অনুগ্রহ কখনো কখনো কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়েই প্রকাশ পায়। আর সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার নয়, সঠিকভাবে বোঝাই হলো কুরআনের তাফসীরের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x