• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২২ : আয়াত ৭৮

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬


তাফসীর | সূরা হাজ্জ : আয়াত ৭৮

তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation


আয়াত (আরবি):

وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ ۚ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ۚ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ ۚ هُوَ مَوْلَاكُمْ ۖ فَنِعْمَ الْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ النَّصِيرُ


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

আর তোমরা আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করো, যেভাবে তাঁর জন্য প্রচেষ্টা করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন, এবং দ্বীনের বিষয়ে তোমাদের ওপর কোনো অসহনীয় বোঝা চাপাননি। এটাই তোমাদের পিতা ইবরাহীমের জীবনপথ। তিনি আগেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন মুসলিম, আর এই কুরআনেও তাই— যাতে রাসূল তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হন এবং তোমরা মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে পারো। অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করো (সালাত কায়েম করো), পরিশুদ্ধ হও (যাকাত প্রদান করো) এবং আল্লাহকেই দৃঢ়ভাবে ধারণ করো। তিনিই তোমাদের অভিভাবক— তিনি কত উত্তম অভিভাবক, কত উত্তম সাহায্যকারী।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা হাজ্জের ৭৭ ও ৭৮ নম্বর আয়াত একসাথে একটি পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্র। ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের অভ্যন্তরীণ অবস্থান (নত হওয়া, আত্মসমর্পণ, দাসত্ব, সৎকর্ম) নির্ধারণ করেন। আর ৭৮ নম্বর আয়াতে তিনি সেই অবস্থান থেকে সমাজ ও ইতিহাসে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। অর্থাৎ ২২:৭৮ হলো ২২:৭৭–এর স্বাভাবিক পরিণতি।

“আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা

আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে:
“ওয়াজাহিদু ফিল্লাহি হাক্কা জিহাদিহি”—আল্লাহর জন্য যথার্থ জিহাদ করো।

কুরআনের ভাষায় জিহাদ মানে কেবল যুদ্ধ নয়। জিহাদ শব্দটি এসেছে ج هـ د ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো—সর্বোচ্চ চেষ্টা, সর্বশক্তি প্রয়োগ, অন্তরের গভীরতম স্তর পর্যন্ত প্রয়াস। এখানে কোনো অস্ত্র, যুদ্ধ বা সহিংসতার কথা বলা হয়নি; বরং বলা হয়েছে আল্লাহর জন্য জিহাদ।

কুরআনের সামগ্রিক আলোকে জিহাদ মানে হলো—

  • সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য চিন্তাগত সংগ্রাম
  • অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধ
  • আল্লাহর ন্যায়নীতি বাস্তবায়নের জন্য সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা

এটি সেই জিহাদ, যা মানুষকে ভেতর থেকে বদলায় এবং সমাজকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করে। তাই “হাক্কা জিহাদিহি” বলতে বোঝানো হচ্ছে—আল্লাহ যেমন জিহাদ চান, ঠিক সেই মান ও উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা।

নির্বাচিত হওয়া এবং দ্বীনে কোনো সংকীর্ণতা নেই

এরপর আল্লাহ বলেন, “তিনি তোমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন”। এই নির্বাচন কোনো জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়; বরং দায়িত্বের নির্বাচন। কুরআনে নির্বাচন মানে সবসময় দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি।

একই সঙ্গে আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন—
“দ্বীনের বিষয়ে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।”
অর্থাৎ ইসলাম কোনো দমবন্ধ করা ব্যবস্থা নয়। এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনপথ। যেখানে দ্বীনকে কঠিন করে তোলা হয়, সেখানে আসলে মানুষের ব্যাখ্যাই দ্বীনের উপর চাপানো হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়।

ইবরাহীমের মিল্লাত: পরিচয়ের ভিত্তি

এই আয়াতে ইসলামকে সংযুক্ত করা হয়েছে ইবরাহীম (আ.)–এর মিল্লাতের সাথে। এর মাধ্যমে কুরআন জানিয়ে দেয়—ইসলাম কোনো নতুন বা বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়; বরং এটি এক ধারাবাহিক তাওহিদী জীবনদর্শন। ইবরাহীমের মিল্লাত মানে হলো—শিরক বর্জন, সত্যের প্রতি একনিষ্ঠতা, এবং সামাজিকভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—“মুসলিম” নামটি আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। মুসলিম মানে কেবল একটি পরিচয় নয়; মুসলিম মানে হলো যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে।

সাক্ষী হওয়ার দায়িত্ব: ব্যক্তিগত ধার্মিকতা থেকে বৈশ্বিক দায়

এই আয়াতের অন্যতম গভীর অংশ হলো—
“যাতে রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন এবং তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হও।”

এখানে মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। মুসলিমরা শুধু নিজেদের নাজাতের জন্য নয়; বরং মানুষের সামনে সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য নির্বাচিত। এর মানে হলো—মুসলিমদের জীবন, সমাজ ও ন্যায়নীতি দেখে মানুষ যেন আল্লাহর দ্বীনের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারে।

এই সাক্ষ্য কেবল কথায় নয়; বরং আচরণ, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও নৈতিক শক্তির মাধ্যমে।

সালাত ও যাকাত: সংযোগ ও পরিশুদ্ধির প্রতীক

এরপর আল্লাহ বলেন—সালাত কায়েম করো ও যাকাত প্রদান করো। কুরআনিস্ট দৃষ্টিতে সালাত মানে আল্লাহর সাথে ও সমাজের সাথে সংযোগ স্থাপন, আর যাকাত মানে পরিশুদ্ধি ও ভারসাম্য সৃষ্টি। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন রিচুয়াল নয়; বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অংশ।

আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন—“আল্লাহকেই দৃঢ়ভাবে ধারণ করো”। অর্থাৎ সংকট, দ্বন্দ্ব, চাপ ও প্রতিকূলতার সময় মানুষের উপর নয়, ব্যবস্থার উপর নয়—আল্লাহর উপর নির্ভর করো। কারণ তিনিই প্রকৃত অভিভাবক ও সাহায্যকারী।


এই আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য আয়াতসমূহ (সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ)

  • সূরা বাকারা : ১৪৩
    মুসলিম উম্মাহকে “মধ্যম জাতি” বলা হয়েছে—যাতে তারা মানুষের ওপর সাক্ষী হয়।
  • সূরা হজ্জ : ৪০
    অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও ন্যায় রক্ষার কথা বলা হয়েছে—যা জিহাদের বাস্তব রূপ।
  • সূরা আনআম : ১৬১–১৬৩
    ইবরাহীমের মিল্লাত ও একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের ঘোষণা।
  • সূরা শুরা : ১৩
    দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো সহজ ও একীভূত বলে ঘোষণা।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা

আজ মুসলিম সমাজ হয় অতিরিক্ত কঠোরতায় দ্বীনকে বিকৃত করছে, নয়তো দ্বীনের সামাজিক দায়িত্ব ভুলে কেবল ব্যক্তিগত আচারেই সীমাবদ্ধ থাকছে। সূরা হাজ্জ ২২:৭৮ এই দুই চরমপন্থার সংশোধন করে। এটি জানিয়ে দেয়—ইসলাম সহজ, কিন্তু দায়িত্বহীন নয়; শান্তিপূর্ণ, কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয়।


সংক্ষেপে উপসংহার

সূরা হাজ্জ ২২:৭৮ আমাদের শেখায়—
আল্লাহর পথে জিহাদ মানে সর্বোচ্চ নৈতিক ও সামাজিক প্রচেষ্টা, ইসলাম কোনো সংকীর্ণ জীবনব্যবস্থা নয়, মুসলিম পরিচয় মানে মানুষের সামনে সত্যের সাক্ষী হওয়া, আর আল্লাহই আমাদের একমাত্র অভিভাবক ও সাহায্যকারী।

২২:৭৭ আত্মসমর্পণের ডাক,
২২:৭৮ দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x