• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ১৭৬

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৬৯ Time View
Update : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ১৭৬

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

يَسْتَفْتُونَكَ ۖ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ ۚ إِنِ امْرُؤٌ هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَهُ أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ ۚ وَهُوَ يَرِثُهَا إِن لَّمْ يَكُن لَّهَا وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ ۚ وَإِن كَانُوا إِخْوَةً رِّجَالًا وَنِسَاءً فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۗ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَن تَضِلُّوا ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

তারা তোমার কাছে বিধান জানতে চায়। বলো—আল্লাহ তোমাদেরকে ‘কালালাহ’ সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন। যদি কোনো ব্যক্তি সন্তানবিহীন অবস্থায় মারা যায় এবং তার একটি বোন থাকে, তবে সে পাবে তার রেখে যাওয়া সম্পদের অর্ধেক। আর যদি কোনো নারীর সন্তান না থাকে, তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। আর যদি দুই বোন থাকে, তবে তারা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। আর যদি ভাই-বোন একাধিক হয়—পুরুষ ও নারী—তবে এক পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান। আল্লাহ তোমাদের জন্য পরিষ্কারভাবে বিধান দিচ্ছেন, যাতে তোমরা বিভ্রান্ত না হও। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসার ১৭৬ নম্বর আয়াতটি এই সূরার শেষ আয়াত এবং উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কিত আলোচনার একটি সমাপনী ঘোষণা। সূরার শুরুতেই (৪:১১–১২) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মৌলিক বিধান দেওয়া হয়েছিল। এখন সূরার শেষে আবার “কালালাহ” প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—উত্তরাধিকার বিষয়টি ইসলামে কতটা গুরুত্ব বহন করে।

আয়াতটি শুরু হয়েছে— “يَسْتَفْتُونَكَ” — তারা তোমার কাছে ফতোয়া বা বিধান জানতে চায়। অর্থাৎ সাহাবীগণ উত্তরাধিকার বিষয়ে স্পষ্টতা চাইছিলেন। এটি একটি বাস্তব সামাজিক প্রশ্ন ছিল। জটিল পারিবারিক কাঠামোর ক্ষেত্রে কীভাবে সম্পদ বণ্টন হবে—এ নিয়ে দ্বিধা দেখা দিচ্ছিল। আল্লাহ নিজেই সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন— “قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ” — বলো, আল্লাহ তোমাদেরকে কালালাহ সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন।

“কালালাহ” শব্দটি এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যে সন্তান ও পিতা ছাড়া মারা যায়। অর্থাৎ সরাসরি উত্তরসূরি নেই। এই ধরনের ক্ষেত্রে সম্পদ বণ্টন কীভাবে হবে—তা এই আয়াতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথম পরিস্থিতি—যদি কোনো পুরুষ সন্তানবিহীন অবস্থায় মারা যায় এবং তার একটি বোন থাকে, তবে সে পাবে সম্পদের অর্ধেক। এখানে লক্ষ্যণীয়, বোনকে অর্ধেক অংশ দেওয়া হয়েছে। এটি নারীর অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম-পূর্ব সমাজে নারী উত্তরাধিকার পেত না; কিন্তু কুরআন তাকে নির্দিষ্ট অংশ দিয়েছে।

এরপর বলা হয়েছে—যদি কোনো নারী সন্তানবিহীন অবস্থায় মারা যায়, তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। অর্থাৎ পারস্পরিক উত্তরাধিকার স্বীকৃত হয়েছে। পরিবার একটি পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের কাঠামো।

যদি দুই বোন থাকে, তবে তারা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। এটি সূরা ৪:১১-এর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে দুই বা ততোধিক মেয়ের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কুরআনের আইন একটি সমন্বিত কাঠামো; এক আয়াত অন্য আয়াতকে সম্পূর্ণ করে।

এরপর বলা হয়েছে—যদি ভাই-বোন একাধিক হয়, পুরুষ ও নারী উভয় থাকে, তবে এক পুরুষের অংশ দুই নারীর অংশের সমান। এখানে আবার দায়িত্বভিত্তিক বণ্টনের নীতি কার্যকর হয়েছে। পুরুষের উপর আর্থিক দায়িত্ব বেশি—তাই তার অংশও বেশি।

আয়াতের শেষাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— “يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَن تَضِلُّوا” — আল্লাহ তোমাদের জন্য পরিষ্কারভাবে বিধান দিচ্ছেন, যাতে তোমরা বিভ্রান্ত না হও। অর্থাৎ উত্তরাধিকার আইন কোনো জটিলতা সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং বিভ্রান্তি দূর করার জন্য। মানুষ আবেগপ্রবণ, পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিধান স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ।

এরপর বলা হয়েছে— “وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ” — আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। এখানে “আলীম” গুণটি উল্লেখ করে বোঝানো হয়েছে—এই আইন মানুষের সীমিত জ্ঞানের উপর নির্ভর করে নয়; বরং সর্বজ্ঞ সত্তার নির্ধারণ।

এই আয়াত ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার একটি সমাপনী রূপ। সূরা আন-নিসার শুরুতে পরিবার, নারী-অধিকার, সম্পদ সুরক্ষা—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শেষে আবার উত্তরাধিকার আইন দিয়ে সূরার সমাপ্তি হয়েছে। এটি দেখায়—সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সম্পদের সুষম বণ্টন কত গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সমাজে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, বঞ্চনা সাধারণ বিষয়। অনেক সময় নারীরা তাদের প্রাপ্য অংশ পায় না। কেউ সামাজিক চাপে অধিকার ছেড়ে দেয়, কেউ জোরপূর্বক বঞ্চিত হয়। কিন্তু এই আয়াত ঘোষণা করে—এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। মানুষের আবেগ বা সংস্কার দিয়ে তা পরিবর্তন করা যাবে না।

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উত্তরাধিকার কোনো পারিবারিক অনুগ্রহ নয়; এটি আইনি অধিকার। এবং এই আইন বিভ্রান্তি দূর করে, অবিচার কমায়, পারিবারিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—উত্তরাধিকার বিষয়ে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কালালাহ সংক্রান্ত জটিল পরিস্থিতিতেও কুরআনের বিধান স্পষ্ট। নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আবেগ বা সামাজিক রীতি দিয়ে আইন পরিবর্তন করা যাবে না। এবং মনে রাখতে হবে—আল্লাহ সর্বজ্ঞ; তাঁর নির্ধারণেই প্রকৃত ন্যায় নিহিত।

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধান যথাযথভাবে মানার তাওফিক দিন এবং পরিবারব্যবস্থায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তি দিন।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x