লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআনে “সূন্নাতুল্লাহ”—অর্থাৎ আল্লাহর নীতি ও বিধান—একটি সুস্পষ্ট ও কেন্দ্রীয় ধারণা। কিন্তু কিছু হাদিসে রাসূলের সূন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নতকে এমনভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রথম দর্শনে সূন্নতের উৎস ও কর্তৃত্ব বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। প্রশ্নটি হলো—আল্লাহর সূন্নতের পাশাপাশি রাসূল ও খোলাফাদের সূন্নতকে স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করলে কি সূন্নতের ক্ষেত্রে বহু উৎস তৈরি হয় না?
১) মতভেদের সময় সূন্নত আঁকড়ে ধরা
আরবি:
فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ مِنْ بَعْدِي، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
বাংলা অর্থ:
“আমার পরে তোমরা অনেক মতভেদ দেখবে। তখন তোমরা আমার সূন্নত ও আমার পর সৎপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নতকে আঁকড়ে ধরবে।”
(আবূ দাঊদ, তিরমিযি, ইবনে মাযাহ, আহমদ; মেশকাত ১/১৫৮)
২) পরিত্যক্ত সূন্নত জিন্দা করার সওয়াব
আরবি:
مَنْ أَحْيَا سُنَّةً مِنْ سُنَّتِي قَدْ أُمِيتَتْ بَعْدِي فَإِنَّ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلَ أُجُورِ مَنْ عَمِلَ بِهَا
বাংলা অর্থ:
“যে ব্যক্তি আমার কোনো সূন্নতকে জিন্দা করল, যা আমার পরে পরিত্যক্ত হয়েছিল—তার জন্য সে সব লোকের সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে যারা এর উপর আমল করবে।”
(তিরমিযি, ইবনে মাযাহ; মেশকাত ১/১৬১–১৬২)
৩) সূন্নতকে ভালোবাসা ও জান্নাতের ঘোষণা
আরবি:
مَنْ أَحَبَّ سُنَّتِي فَقَدْ أَحَبَّنِي، وَمَنْ أَحَبَّنِي كَانَ مَعِي فِي الْجَنَّةِ
বাংলা অর্থ:
“যে আমার সূন্নতকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে; আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সাথে থাকবে।”
(তিরমিযি; মেশকাত ১/১৬৬)
এই বর্ণনাগুলোতে রাসূলের সূন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সূন্নতকে এমনভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, যেন সূন্নতের ক্ষেত্রে একাধিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ কুরআন সূন্নত বলতে একটিই সূন্নতকে চিহ্নিত করেছে—সূন্নাতুল্লাহ। ফলে প্রশ্ন ওঠে—আল্লাহর সূন্নতের পাশাপাশি অন্য সূন্নতকে স্বতন্ত্র মানদণ্ড বানালে কি সূন্নতের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব (শিরকের ধারণা) তৈরি হয় না?
আরবি:
سُنَّةَ اللَّهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلُ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
বাংলা অর্থ:
“এটি আল্লাহর সূন্নত—যা পূর্ব থেকেই চলে আসছে; তুমি আল্লাহর সূন্নতে কোনো পরিবর্তন পাবে না।”
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬২)
➡️ কুরআনে ‘সূন্নত’ শব্দটি ধারাবাহিকভাবে আল্লাহর সাথেই যুক্ত।
আরবি:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
বাংলা অর্থ:
“বিধান তো একমাত্র আল্লাহরই।”
(সূরা ইউসুফ ১২:৪০)
➡️ ধর্মীয় মানদণ্ড ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উৎস আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নয়।
আরবি:
مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ
বাংলা অর্থ:
“রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া।”
(সূরা আল-মায়িদা ৫:৯৯)
➡️ রাসূল নিজে কোনো স্বতন্ত্র বিধানপ্রণেতা নন; তিনি আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেন।
এই হাদিসগুলোকে যদি আক্ষরিক অর্থে স্বতন্ত্র শরিয়তি উৎস হিসেবে ধরা হয়, তবে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়—
কুরআনের আলোকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো—
এই হাদিসগুলোর উদ্দেশ্য কুরআনের পথ ও নীতির উপর অটল থাকা, ব্যক্তিবিশেষের আচরণকে চিরস্থায়ী ধর্মীয় মানদণ্ড বানানো নয়।
কুরআনের দৃষ্টিতে—
অতএব, আলোচ্য হাদিসগুলোকে যদি আল্লাহর সূন্নতের সমান্তরাল বা সমমর্যাদার সূন্নত হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা কুরআনিক একত্ববাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একমাত্র অবস্থান হলো—আল্লাহর সূন্নতই চূড়ান্ত মানদণ্ড; অন্য সবই তার অধীন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগমাত্র।
শেষ কথা:
সূন্নতের ক্ষেত্রে আল্লাহ একক।
যেখানে সূন্নত বহুগুণে ভাগ হয়—সেখানেই কুরআনের মৌলিক শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
