লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন তাওরাত প্রদানের ঘটনাকে ঐতিহাসিক সময়, স্থান ও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণনা করে—মূসার সঙ্গে পর্বতে আল্লাহর সংলাপ, ফলকে লেখা উপদেশ, এবং তা শক্তভাবে ধারণ করার নির্দেশ। কিন্তু প্রচলিত একটি হাদিসে দাবি করা হয়—আদম সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই তাওরাত লেখা হয়েছিল এবং সেই লেখার দোহাই দিয়ে মানুষের কর্মকে আগাম নির্ধারিত বলে উপস্থাপন করা হয়। এতে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: আল্লাহ কি আদমের আগে তাওরাত লিখেছিলেন? আর আগেই লেখা থাকলে মানবকর্মের দায়ভার কার?
আরবি:
قَالَ يَا مُوسَىٰ إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا آتَيْتُكَ وَكُن مِّنَ الشَّاكِرِينَ وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِن كُلِّ شَيْءٍ مَّوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِّكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا
বাংলা অর্থ:
“[পাহাড়ে সংজ্ঞাহীন মূসার জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর আল্লাহ বললেন:] হে মূসা! আমি তোমাকে মানুষের উপর মনোনীত করেছি আমার বার্তাসমূহ ও আমার কথোপকথনের দ্বারা; সুতরাং আমি যা দিয়েছি তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর আমি তার জন্য ফলকে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি; সুতরাং এগুলো শক্তভাবে ধর এবং তোমার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দাও যেন তারা এর উত্তমটি গ্রহণ করে।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৪৪–১৪৫)
মূল শিক্ষা:
আরবি (সারসংক্ষেপ):
… قَالَ آدَمُ: فَهَلْ تَلُومُنِي عَلَى أَمْرٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيَّ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَنِي بِأَرْبَعِينَ سَنَةً؟
বাংলা অর্থ (সারাংশ):
মূসা আদমকে বললেন—আপনার ত্রুটির কারণে মানবজাতি জমিনে নেমে এসেছে। আদম জবাবে বললেন—তুমি কি জান, আল্লাহ আমার সৃষ্টির কতকাল আগে তাওরাত লিখেছিলেন? মূসা বললেন—চল্লিশ বছর আগে। তখন আদম বললেন—তবে কি তুমি আমাকে এমন একটি কাজের জন্য তিরস্কার করছো, যা আল্লাহ আমার সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগেই লিখে রেখেছিলেন?
(মুসলিম; মেশকাত ১/৭৫)
এই হাদিসে তিনটি দাবি স্পষ্ট—
এগুলো কুরআনের সময়বিন্যাস, পরীক্ষা ও ন্যায়বিচারের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন।
কুরআন প্রতিটি কিতাবকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে নাজিল বলে। তাওরাত—মূসার কাছে; ইনজিল—ঈসার কাছে; কুরআন—মুহাম্মদের কাছে। আদমের আগেই তাওরাত লেখা—এমন কোনো কুরআনিক ইঙ্গিত নেই।
আরবি:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
বাংলা অর্থ:
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮)
➡️ আগেই লেখা থাকলে দায়বদ্ধতা অর্থহীন হয়।
আরবি:
إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا
বাংলা অর্থ:
“আমি তাকে পথ দেখিয়েছি—হোক সে কৃতজ্ঞ, অথবা অকৃতজ্ঞ।”
(সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)
➡️ কুরআনে নির্বাচন মানুষের; আগাম বাধ্যতামূলক লেখা নয়।
আরবি:
وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ
বাংলা অর্থ:
“তোমার রব বান্দাদের প্রতি জুলুমকারী নন।”
(সূরা ফুসসিলাত ৪১:৪৬)
➡️ আগেই কর্ম লিখে দিয়ে পরে শাস্তি—এটি জুলুমের প্রশ্ন তোলে, যা কুরআন নাকচ করে।
তুলনা করলে স্পষ্ট—
এই হাদিসকে আক্ষরিকভাবে নিলে—
যা কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে অসঙ্গত।
কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—
ফয়সালা:
যদি আদমের সৃষ্টির আগেই তাওরাত লেখা ও মানবকর্ম নির্ধারিত বলে ধরা হয়, তবে সকল অপকর্মের দায়ভার মানুষের নয়—আল্লাহর উপরই বর্তায়, যা কুরআনের ন্যায়বিচার ও পরীক্ষার দর্শনের পরিপন্থী।
অতএব, আলোচ্য হাদিসটি কুরআনিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই প্রতীয়মান হয়।
