• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

রাসূল গায়েব জানতেন না—তবে সৃষ্টির হাজার বছর আগের খবর কীভাবে জানা হলো?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৯ Time View
Update : সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

রাসূল গায়েব জানতেন না—তবে সৃষ্টির হাজার বছর আগের খবর কীভাবে জানা হলো?

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

কুরআন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। রাসূল নিজে বারবার বলেছেন—তিনি গায়েব জানেন না। অথচ প্রচলিত কিছু হাদিসে বলা হয়—আসমান–জমিন সৃষ্টির এক/দুই হাজার বছর আগে কী লেখা হয়েছিল, কোন সূরা পাঠ করা হয়েছিল—এসব বিষয়ে রাসূল খবর দিয়েছেন। এতে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: যে রাসূল নিজেই গায়েব জানার দাবি অস্বীকার করেন, তিনি কীভাবে সৃষ্টির বহু হাজার বছর আগের ঘটনাবলি জানলেন?


কুরআনের বক্তব্য: রাসূল গায়েব জানতেন না (আরবি ও বাংলা)

১) গায়েব জানার স্পষ্ট অস্বীকৃতি

আরবি:

قُل لَّا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ
বাংলা অর্থ:
“বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার আছে; আর না আমি গায়েব জানি।”
(সূরা আল-আন‘আম ৬:৫০)


২) গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর

আরবি:

قُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ
বাংলা অর্থ:
“বলুন, গায়েবের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই।”
(সূরা ইউনুস ১০:২০)


৩) নূহের বক্তব্যের মাধ্যমে নীতি

আরবি:

وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ
বাংলা অর্থ:
“আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর না আমি গায়েব জানি।”
(সূরা হূদ ১১:৩১)

➡️ নবীদের ব্যাপারে নীতি এক—গায়েব জানা তাদের দাবি নয়


৪) গায়েব জানলে অকল্যাণ স্পর্শ করত না

আরবি:

وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ
বাংলা অর্থ:
“আমি যদি গায়েব জানতাম, তবে তো আমি প্রচুর কল্যাণ লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৮৮)

➡️ রাসূল নিজেই গায়েব-জ্ঞান অস্বীকার করেছেন।


প্রচলিত হাদিস: সৃষ্টির হাজার বছর আগের খবর (আরবি ও বাংলা)

১) দুই হাজার বছর আগে লেখা কিতাব ও সূরা বাকারা

আরবি (সারাংশ):

إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ كِتَابًا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِأَلْفَيْ سَنَةٍ، أَنْزَلَ مِنْهُ آيَتَيْنِ خَتَمَ بِهِمَا سُورَةَ الْبَقَرَةِ…

বাংলা অর্থ:
“আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির দুই হাজার বছর পূর্বে একটি কিতাব লিখেছিলেন; সেখান থেকে দুইটি আয়াত নাযিল করেছেন, যেগুলো দ্বারা সূরা বাকারা সমাপ্ত করা হয়েছে…”
(তিরমিযি, দারেমী; মেশকাত ৫/২০৪২)


২) এক হাজার বছর আগে সূরা তা-হা ও ইয়াসিন পাঠ

আরবি (সারাংশ):

قَرَأَ اللَّهُ طَهَ وَيَس قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِأَلْفِ سَنَةٍ

বাংলা অর্থ:
“আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির এক হাজার বছর পূর্বে সূরা ‘তা-হা’ ও ‘ইয়াসিন’ পাঠ করেছিলেন।”
(দারেমী; মেশকাত ৫/২০৪৫)


সমস্যার মূল দিক

এই হাদিসগুলোতে দাবি করা হচ্ছে—

  • সৃষ্টির হাজার/দুই হাজার বছর আগের ঘটনা
  • কোন কিতাব লেখা হয়েছিল
  • কোন সূরা কখন পাঠ করা হয়েছিল

প্রশ্ন হলো—

  • রাসূল কি গায়েব জানতেন?
  • যদি না জানতেন, তবে এত প্রাচীন অদৃশ্য সময়ের খবর এল কোথা থেকে?
  • কুরআনের সুস্পষ্ট অস্বীকৃতির সাথে এসব বর্ণনা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ

১) রাসূল কেবল ওহীর অনুসারী

আরবি:

إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ
বাংলা অর্থ:
“আমি তো কেবল তাই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহী করা হয়।”
(একাধিক আয়াতের নীতি)

➡️ কুরআনে কোথাও সৃষ্টির হাজার বছর আগের ঘটনা সম্পর্কে ওহী নাযিল হওয়ার কথা নেই।


২) কুরআনে এমন তথ্য অনুপস্থিত

যদি এসব তথ্য সত্যিই ওহীর অংশ হতো, তবে—

  • কুরআনে অন্তত ইঙ্গিত থাকত
  • কিন্তু কুরআনে নেই
    • “দুই হাজার বছর আগে কিতাব লেখা”
    • “আল্লাহ সূরা তা-হা/ইয়াসিন পাঠ করেছেন”—এমন বর্ণনা

৩) গায়েবের জ্ঞান ভাগাভাগি নয়

আরবি:

قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ
বাংলা অর্থ:
“বলুন, আসমানসমূহ ও জমিনে যারা আছে—আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।”
(সূরা আন-নামল ২৭:৬৫)

➡️ এই আয়াতের আলোকে রাসূলও গায়েব-জ্ঞানে অংশীদার নন


ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ

এখানে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব দেখা যায়—

  • কুরআন:
    • রাসূল গায়েব জানেন না
    • গায়েব একান্তই আল্লাহর
    • রাসূল কেবল প্রকাশিত ওহীই জানেন
  • হাদিস:
    • সৃষ্টির হাজার বছর আগের অদৃশ্য তথ্য
    • কিতাব লেখা ও সূরা পাঠের খবর

এই হাদিসগুলোকে আক্ষরিক সত্য ধরলে—

  • রাসূল কার্যত গায়েব-জ্ঞানী হয়ে যান
  • কুরআনের একাধিক আয়াত অকার্যকর হয়ে পড়ে

যা গ্রহণযোগ্য নয়।


উপসংহার

কুরআনের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—

  • রাসূল গায়েব জানতেন না—এটি কুরআনের ঘোষণা
  • গায়েবের জ্ঞান কেবল আল্লাহর
  • সৃষ্টির হাজার বছর আগের ঘটনা সম্পর্কে রাসূলের জানার কথা কুরআনে নেই

ফয়সালা:
যে হাদিসগুলো রাসূলকে সৃষ্টির বহু হাজার বছর আগের গায়েবি ঘটনাবলির জ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করে, সেগুলো কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
অতএব, এই বর্ণনাগুলো কুরআনিক মানদণ্ডে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ

রাসূল গায়েব জানতেন না—তবে সৃষ্টির হাজার বছর আগের খবর কীভাবে জানা হলো?


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page