মিলাদের দাওয়াতে অংশগ্রহণ: কুরআনিক দৃষ্টিতে একটি পর্যালোচনা
লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
মুসলিম সমাজে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে ‘মিলাদ’ নামে একটি অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এই অনুষ্ঠানে সাধারণত নাত, দোয়া, মাহফিল, খুতবা ও খাবারের আয়োজন করা হয় এবং এর সাথে যুক্ত থাকে সওয়াব, ভালোবাসা ও সম্মানের মতো ধর্মীয় শব্দাবলি। মিলাদকে অনেকেই ইবাদত, অনেকে সুন্নাহ এবং অনেকে ঈমানের প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। এর বিপরীতে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—এই অনুষ্ঠান কি কুরআনে প্রতিষ্ঠিত? এবং কেউ যদি মিলাদের দাওয়াত দেয়, তবে একজন কুরআননিষ্ঠ মুমিনের অবস্থান কী হওয়া উচিত? এই প্রশ্ন কেবল ধর্মীয় অনুশীলনের সীমা নির্ধারণের বিষয় নয়, বরং দ্বীনের চরিত্র, ইবাদতের প্রকৃতি, তাওহীদের সংজ্ঞা এবং সামাজিক সম্পর্কের নীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
দ্বীনকে কুরআন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সূরা মায়েদার সেই সুপরিচিত ঘোষণা—“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম…”—দ্বীনের পরিপূর্ণতা ও সমগ্রতা নিশ্চিত করে দেয়। এই ঘোষণার পর দ্বীনের ভিতরে নতুন কোনো ইবাদত, উৎসব, রীতি বা আচার সংযোজনের প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। কারণ ‘পূর্ণ’ হওয়ার অর্থ হলো এর ভিতর যা থাকবে তা আল্লাহ নির্দেশ করবেন, এবং যা থাকবে না তা মানুষের পক্ষ থেকে উদ্ভাবনযোগ্য কোনো ক্ষেত্র নয়। ইবাদতকে কুরআন বারবার আল্লাহর জন্য একচেটিয়া ঘোষণা করেছে—“তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি ইবাদত করো না”—এ কথাটি তাওহীদের মৌলিক সারাংশ। ইবাদতের এই একচেটিয়াত্বই দ্বীনের চরিত্র।
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—মিলাদ কি ইবাদত? অনেকেই এটিকে শুধু ইতিহাস স্মরণ বা নবীর জন্ম স্মরণ বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু বাস্তবতাটি এর চেয়ে গভীর। কারণ মিলাদ শুধুমাত্র স্মরণ নয়; এটি একটি অনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে—নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট বয়ান, নির্দিষ্ট সওয়াবের দাবি, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ধর্মীয় তাৎপর্যের সাথে। ইবাদত তখনই ইবাদত হয় যখন তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয় এবং তা সওয়াব বা আনুগত্যের বিনিময়ে সম্পন্ন হয়। মিলাদের ক্ষেত্রে এই দুই উপাদানই বিদ্যমান, পার্থক্য শুধু উদ্দেশ্যে। মিলাদের পুরো অনুষ্ঠান নবীর উদ্দেশ্যে, নবীর সম্মানে এবং নবীর সন্তুষ্টিতে সম্পন্ন হয়। এখানে ইবাদত আল্লাহর থেকে সরে নবীর দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। কুরআনের সংজ্ঞায় এটি ইবাদতের কেন্দ্রচ্যুতি।
শিরকের ধারণাটি কুরআনে বহুমাত্রিক। শিরক মানেই শুধু মূর্তি বা দেবতা স্থাপন নয়, বরং ইবাদতে, আনুগত্যে, ভালোবাসায়, উৎসর্গে এবং অনুষ্ঠানে অন্যকে শরিক করা। সূরা তাওবার নবম অধ্যায়ে কুরআন বর্ণনা করে, যেসব আহলে-কিতাব তাদের আলেম-রাহেবদেরকে বিধানদাতা বানিয়েছিল, তারাও শিরকে লিপ্ত হয়েছিল—যদিও তারা তাদের ইবাদত করছিল না। সেখানে শিরক ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রদান। এ দৃষ্টিতে নবীর উদ্দেশ্যে ইবাদত বা অনুষ্ঠান তৈরি করা আরও স্পষ্ট ধরনের কেন্দ্রচ্যুতি। কারণ এখানে ইবাদতের রূপটি সরাসরি, উদ্দেশ্যগত এবং অনুষ্ঠানিক। মিলাদে নাত, দোয়া, মিলাদুন্নবীর ঘোষণা, নবীর খুশির জন্য আয়োজন, ‘মিলাদের সওয়াব’ বা ‘নবীর সন্তুষ্টি’, এসব ভাষা ব্যবস্থার ভেতরেই ইবাদতের সংকেত বহন করে।
কিন্তু প্রশ্ন আসে—নবীর প্রতি ভালোবাসা কী শিরক?
উত্তর অবশ্যই না। বরং নবীর প্রতি ভালোবাসা কুরআন ও ঈমানের দাবি। তবে সেই ভালোবাসা কিভাবে প্রকাশ পাবে সে প্রশ্নে কুরআন স্পষ্ট। সূরা আল ইমরানের বিখ্যাত আয়াত—“তারা বলে: আমরা আল্লাহ ও রাসূলকে ভালোবাসি; বল: তবে আমার অনুসরণ করো”—এখানে ভালোবাসার পথ হিসেবে অনুসরণকে নির্ধারণ করা হয়েছে, অনুষ্ঠানকে নয়। কুরআনের ভাষায় নবীকে সম্মান মানে আনুগত্য, অনুষ্ঠান নয়; অনুসরণ, উৎসব নয়; বিধান, বর্ণনা নয়; বাস্তব, আবেগ নয়।
মিলাদ যদি শুধুমাত্র সামাজিক দাওয়াত বা খাবারের অনুষ্ঠান হতো, তবে কুরআনিক দৃষ্টিতে এর স্থান ভিন্ন হতো। কুরআন সামাজিক সম্পর্ক, আত্মীয়তা এবং সদাচার ভাঙতে বলে না। বরং তা সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দেয়—“সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” আবার নির্দেশ দেয়—“সৎকাজে সহযোগিতা করো, পাপে নয়।” তাই মিলাদ যদি সাংস্কৃতিক রূপে থাকতো, তবে সে সম্পর্কে সামাজিক অংশগ্রহণে কোনো বাধা থাকতো না। কিন্তু সমস্যাটি তখনই শুরু হয় যখন সামাজিক রূপটি ধর্মীয় রূপের সাথে মিশে যায় এবং জন্ম হয় ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠান’-এর। তখন দাওয়াতে অংশগ্রহণ মানে সেই ধর্মীয় ধারণাকে অনুমোদন করা। কুরআনের ভাষায় এটি “পাপে সহযোগিতা” বা ‘মিথ্যা ব্যবস্থার সমর্থন’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু তা-ই নয়, মিলাদে একটি সূক্ষ্ম মানসিক কেন্দ্রচ্যুতি ঘটে—আল্লাহর উদ্দেশ্য থেকে নবীর উদ্দেশ্যে। কুরআনে ইবাদতের কেন্দ্র আল্লাহ এবং উৎসবের কেন্দ্রও আল্লাহ। ইসলামী উৎসব যেমন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা কোনো ঘটনার স্মরণে নয়, বরং আল্লাহর বিধান পূরণ করার পর উদ্ভূত আনন্দে। ঈদের আনন্দ আসে সিয়াম ও কুরবানির মাধ্যমে আনুগত্য সম্পন্ন করার পর। ফলে উৎসবের চরিত্র ইলাহি বিধান ভিত্তিক, ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু ভিত্তিক নয়। মিলাদে জন্মকে কেন্দ্রবিন্দু করা কুরআনের উৎসব ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তার উদ্দেশ্যও ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক সমস্যা হলো—মিলাদ মানুষকে ভুল ধারণায় স্থাপন করে। অনেকের কাছে নবী এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত হন যিনি শুনছেন, উপস্থিত আছেন এবং অনুষ্ঠানে খুশি হন। কুরআনে নবীর ভূমিকা বার্তা প্রেরণকারী, বিচারকারী ও সতর্ককারী; কোনো স্থানেই তাঁকে মানুষের উদ্দেশ্যে ইবাদত গ্রহণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। নিম্নলিখিত নির্দেশ—“ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্য”—এই স্থানান্তরকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করে।
এখন প্রশ্ন থাকে—
মিলাদের দাওয়াত এলে একজন কুরআননিষ্ঠের অবস্থান কী?
কুরআন সত্য প্রতিষ্ঠা করতে বলে, তবে তা করতে বলে জ্ঞান ও সুন্দর পদ্ধতিতে। কুরআন সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলে না, আবার মিথ্যা সমর্থন করতে বলে না। অতএব একজন মুমিনকে এমন অবস্থান নিতে হবে—যেখানে তিনি ইবাদতসম্মত অনুষ্ঠানকে সমর্থন করবেন না, তবে সামাজিক সম্পর্কও ভাঙবেন না। যদি মিলাদ ইবাদতের দাবি নিয়ে আসে, তবে একজন কুরআননিষ্ঠ সেখানে উপস্থিত হয়ে তা অনুমোদন করতে পারেন না। কিন্তু যদি কেবল খাবারের সামাজিক দাওয়াত হয় এবং তাতে ধর্মীয় অনুমোদনের বার্তা না থাকে, তবে যাওয়া কুরআনিকভাবে বৈধ।
শেষ কথা হলো—
মিলাদ ধর্মীয় ইবাদত হিসেবে কুরআনে নেই; নবীর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা কুরআনিক তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক; এবং দ্বীনের সম্পূর্ণতার নীতির বিরোধী। নবীর ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ অনুষ্ঠান দিয়ে নয়, বরং কুরআন ও নবীর নির্দেশ অনুসরণ করে। তাই কুরআনিক দৃষ্টিতে একজন মুমিনকে ইবাদত ও সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য করতে হবে—দ্বীনের নামে নয়, সমাজের নামে হলে সম্পর্ক রক্ষা করা যায়; কিন্তু ইবাদতের নামে হলে তা সমর্থনের জায়গা হতে পারে না। তাওহীদ ও অনুসরণের পথেই নবীর প্রকৃত সম্মান নিহিত।
