লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
মৃত্যু, আখিরাত ও আযাব—এই তিনটি বিষয় ইসলামে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য আল্লাহর নামে আরোপ করা হলে তা অবশ্যই কুরআনের মীযানে যাচাইযোগ্য হতে হবে। কারণ কুরআন নিজেকে ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেছে। অথচ প্রচলিত বর্ণনায় এমন একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত—মৃতের পরিবারের কান্না-ক্রন্দনে মৃত ব্যক্তি আযাব পায়। এই দাবিটি কুরআনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা এখন কুরআনের আলোকে যাচাই করা জরুরি।
আরবি (সহিহ বুখারি):
إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ
বাংলা অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই মৃত ব্যক্তি তার পরিবারের কান্নার কারণে আযাবপ্রাপ্ত হয়।”
📚 সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১২৮৬
📚 সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৯২৭
এই বর্ণনাটি বাহ্যিকভাবে বোঝায়—মৃত ব্যক্তি এমন কিছুর কারণে শাস্তি পায়, যা সে নিজে করেনি; বরং জীবিত স্বজনদের আচরণ।
কুরআনের একটি অটল নীতি হলো—ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।
আল্লাহ বলেন—
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”
📖 (সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪)
আরও বলেন—
لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জনের ফল পাবে, আর তার কৃতকর্মের দায়ও তারই ওপর।”
📖 (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)
আরও স্পষ্ট করে বলেন—
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিজে চেষ্টা করেছে।”
📖 (সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯)
এই আয়াতগুলো একত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতি স্থাপন করে—
👉 কেউ অন্যের কাজের জন্য শাস্তি পাবে না।
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—
কুরআন অনুযায়ী—আযাব ও প্রতিদান কর্মভিত্তিক, আত্মীয়ভিত্তিক নয়।
এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে আয়েশা (রা.) থেকে, যা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে।
তিনি বলেন—
আরবি:
إِنَّمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِنَّ اللَّهَ لَيَزِيدُ الْكَافِرَ عَذَابًا بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ
বাংলা:
“রাসূল ﷺ আসলে বলেছেন—আল্লাহ কাফিরের আযাব বাড়িয়ে দেন তার পরিবারের কান্নার কারণে।”
📚 সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৯৩২
এরপর আয়েশা (রা.) কুরআনের আয়াত পাঠ করেন—
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
📖 (৬:১৬৪)
অর্থাৎ, তিনি স্পষ্ট করেন—সাধারণভাবে মৃতকে অন্যের কান্নার জন্য আযাব দেওয়ার ধারণা কুরআনসম্মত নয়।
কুরআন কান্নাকে নিষিদ্ধ করেনি।
ইয়াকুব (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে—
وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ
“শোকে তাঁর চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল।”
📖 (সূরা ইউসুফ ১২:৮৪)
এখানে শোক ও কান্না পাপ নয়, বরং মানবিক আবেগ হিসেবে স্বীকৃত।
অতএব—
কুরআনই মীযান।
যে বর্ণনা কুরআনের মৌলিক নীতিকে ভেঙে দেয়—তা দিয়ে আকিদা, আখিরাত বা আযাব নির্ধারণ করা যায় না।
✦✦✦
