ইসলামে কুরআনের মর্যাদা প্রশ্নাতীত। কুরআন আল্লাহর কালাম, হিদায়াতের গ্রন্থ, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির চূড়ান্ত মানদণ্ড। কিন্তু কুরআনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি এমন কোনো বর্ণনা গ্রহণ করা হয়, যা কুরআন নিজেই যে মৌলিক নীতিগুলো স্থাপন করেছে—সেগুলোকেই ভেঙে দেয়, তাহলে সেখানে থামা জরুরি। হযরত আলী (রাঃ)–এর নামে বর্ণিত একটি বহুল আলোচিত হাদিস সেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَحَفِظَهُ، وَأَحَلَّ حَلَالَهُ، وَحَرَّمَ حَرَامَهُ، أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ، وَشَفَّعَهُ فِي عَشَرَةٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، كُلُّهُمْ قَدْ وَجَبَتْ لَهُمُ النَّارُ.
— জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস নং: ২৯০৫
বাংলা সারকথা:
“যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করেছে, মুখস্থ করেছে, এর হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম জেনেছে—আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য সুপারিশের অনুমতি দেবেন, যাদের ওপর জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গিয়েছিল।”
শুনতে আবেগঘন, অনুপ্রেরণামূলক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এটি কি কুরআনের ঘোষিত বিচারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
হাদিসটির সবচেয়ে গুরুতর বাক্যাংশ হলো:
كُلُّهُمْ قَدْ وَجَبَتْ لَهُمُ النَّارُ
“যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে গেছে।”
কুরআনে “অবধারিত” (وجب) শাস্তির অর্থ কী? কুরআনের ভাষায়, যার ওপর শাস্তি অবধারিত হয়—সে তার নিজের কুফর, জুলুম বা আমলের কারণেই হয়।
কুরআন ঘোষণা করে—
সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কোনো বোঝাবহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”
এটি আখিরাতের বিচারব্যবস্থার ভিত্তি। যদি কারও ওপর তার নিজের আমলের কারণে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়, তবে অন্য কারও কুরআন পাঠের সুবাদে সেই অবধারিত সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়া—এই আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন।
কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে—
সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ কেবল তাই পাবে, যা সে নিজে চেষ্টা করেছে।”
এই আয়াতে কোনো ব্যতিক্রম নেই—না পরিবার, না সন্তান, না হাফেজ আত্মীয়। প্রত্যেক মানুষের আখিরাত তার নিজের প্রচেষ্টার ফল।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—
একজন মানুষের কুরআন পাঠ ও হিফজ কীভাবে অন্য দশজন মানুষের অবধারিত পরিণতি বদলে দেয়?
কুরআন সুপারিশ (শাফাআত) পুরোপুরি অস্বীকার করে না, কিন্তু তাকে কঠোর শর্তে আবদ্ধ করে।
সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ
“তাঁর অনুমতি ছাড়া কে সুপারিশ করতে পারে?”
আর সেই অনুমতির ক্ষেত্রও কুরআন সীমাবদ্ধ করেছে—
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৮
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ
“তারা সুপারিশ করবে কেবল তাদের জন্য, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সন্তুষ্ট।”
যাদের ওপর “জাহান্নাম অবধারিত”—এই ঘোষণার অর্থই হলো, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন। তাহলে কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী, তাদের জন্য সুপারিশ কার্যকর হওয়ার কথা নয়।
এই হাদিস তাই সুপারিশকে ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়—যা কুরআনের সুস্পষ্ট নীতির বিরুদ্ধে।
কুরআন বলে—
সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জনের বিনিময়ে বন্ধক রাখা।”
যদি কেউ নিজের কৃতকর্মের কারণে জাহান্নামের যোগ্য হয়, তবে তাকে সেই “বন্ধক” অবস্থা থেকে অন্যের আমলে মুক্ত করা—এই ধারণা কুরআনের এই ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই হাদিস একটি বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি করে—
“আমাদের পরিবারে একজন কুরআন-হাফেজ আছে, তাই আমরা দশজন বেঁচে যাব।”
কুরআন এই ধারণাকে নির্মমভাবে ভেঙে দেয়—
সূরা লুকমান ৩১:৩৩
وَلَا يَجْزِي وَالِدٌ عَنْ وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَنْ وَالِدِهِ شَيْئًا
“কোনো পিতা তার সন্তানের পক্ষ থেকে কিছুই আদায় করতে পারবে না, কোনো সন্তানও তার পিতার পক্ষ থেকে নয়।”
যখন পিতা–সন্তানের সম্পর্কও আখিরাতে কাউকে রক্ষা করতে পারে না, তখন আত্মীয়তার ভিত্তিতে দশজনের জাহান্নাম বাতিল—এই ধারণা কুরআনের কোন নীতিতে দাঁড়িয়ে?
সূরা আল-ইসরা ১৭:৯
إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ
“নিশ্চয়ই এই কুরআন পথনির্দেশ করে সর্বাধিক সঠিক পথে।”
কুরআন পথ দেখায়; কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ধার করে না। পাঠ, হিফজ ও জ্ঞান—এসব তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের নৈতিক চরিত্র ও আমলে প্রতিফলিত হয়।
এই কারণেই নবী (সা.) কুরআনের অভিযোগ হিসেবে বলেছেন—
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩০
يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
“হে আমার রব, আমার জাতি এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছে।”
কুরআন মুখস্থ করেও যদি তার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির নীতি অস্বীকার করা হয়—এটাও কুরআন পরিত্যাগের একটি রূপ।
হাদিসটি (তিরমিজি ২৯০৫):
কুরআন মানুষকে বাঁচাতে আসে দায়িত্ববোধ দিয়ে—শর্টকাট দিয়ে নয়।
তাই কুরআনের মানদণ্ডে এই হাদিসটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না—তা যত সম্মানিত ব্যক্তির নামেই বর্ণিত হোক না কেন।
কুরআনই মীযান।
আর যে বর্ণনা সেই মীযানে টেকে না—তা দিয়ে আখিরাতের বিচারনীতি নির্মাণ করা যায় না।
